ইতিহাসের পাতায় সন্দ্বীপ-০১: সন্দ্বীপে পুর্তগীজ

ইতিহাসের পাতায় সন্দ্বীপ-০১: সন্দ্বীপে পুর্তগীজ

পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দশকে ভাস্কো ডা গামার ভারত আগমনের সমুদ্রপথ আবিষ্কারের পরপরই ভারতবর্ষের দক্ষিন-পূর্বাঞ্চলে (চট্টগ্রাম) পর্তুগীজদের আনাগোনা শুরু হয়।
চট্টগ্রাম সব সময়ই বন্দরের জন্য বিখ্যাত ছিল আর চট্টগ্রাম তথা পূর্ব-বাঙলায় প্রবেশের একটি পথ হিসেবে সন্দ্বীপ ছিল পর্তুগীজদের একটি পছন্দের জায়গা, সন্দীপকে পুর্তগীজরা বলতো সুনদিভা।

ষোড়শ শতাব্দীতে চট্টগ্রামে পুর্তগীজদের প্রভাব স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান; পুর্তগীজ জেসুইটরা (খ্রীস্টানদের একটি শাখা) চট্টগ্রামে দুটো চার্চ ও বসতি-বাণিজ্য গড়ে তুলে; সে সময় এই অঞ্চলে পুর্তগীজ ও অন্যান্য ইউরোপিয়ানদের সংখ্যা ছিল দুই থেকে তিন হাজার।
পর্তুগীজদের এই অঞ্চলে প্রভাব ছিল প্রায় দেড়শ বছর, ১৫২৮ থেকে ১৬৬৬ সাল পর্যন্ত।

১৫২৮ সালে পর্তুগীজরা বাঙলার সুলতান নাসিরুদ্দিন নুসরাত শাহ হতে চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করার অনুমতি পায়, চট্টগ্রাম বন্দরে নিজেদের কুঠি গড়ে তুলে, যার নাম- পোর্টো গ্র্যান্ডে দ্য বেঙ্গল।
১৫৭৪ সালে বাঙলায় মুঘল শাসন প্রতিষ্টিত হয়।
চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ ও তৎসংলগ্ন এলাকার আধিপত্য নিয়ে তখন মুঘল, আফগান, স্থানীয় রাজা, আরাকানী ও পুর্তগীজদের মাঝে সংঘর্ষ চলছিল।

১৫৯০ সালে পুর্তগীজরা অ্যান্টনিও ডি সউসা গডিনহোর নেতৃত্বে সন্দ্বীপ দখল করে।
সন্দ্বীপ মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় পুর্তগীজরা তাদের ডাকাতি ও রাজ্যবিস্তারের জন্য সন্দ্বীপকে নিরাপদ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে; এছাড়া সন্দ্বীপের লবণ ও জাহাজ নির্মাণ শিল্প ছিল বেশ লাভজনক।
১৬০২ সালে শ্রীপুরের (বিক্রমপুর) রাজা কেদার রায় পুর্তগীজদের কাছ থেকে সন্দ্বীপ জয় করে নেয় কিন্তু এই জয় অতি ছিল স্বল্পায়ুর।
ডোমিঙ্গো কারভেলো ও ম্যানুয়েল ডি মাটোস একই বছর পুনরায় সন্দ্বীপ দখল করে নেয়।

পুর্তগীজদের উপস্থিতি সন্দ্বীপের স্থানীয় মানুষরা ভালোভাবে নেয়নি; কারন, পুর্তগীজরা ছিল অত্যাচারী।
বিশেষ করে ডোমিঙ্গো কারভেলো সন্দ্বীপের স্থানীয় মানুষদের হত্যা-ধর্ষণ ও দাস বানানোর জন্য কুখ্যাত হয়ে আছে।
সন্দ্বীপের তৎকালীন অধিবাসীদের মাঝে আফগানদের বংশধররা ও প্রভাবশালী হিন্দু জমিদাররা ছিল ধনী ও শাসক শ্রেণী।
কিন্তু পুর্তগীজদের উপস্থিতির কারনে এই শ্রেণীটি বেকায়দায় পড়ে; তাই, যখন বিজেতা হিসেবে আফগান ও মুঘল সন্দ্বীপে আগমন করে, তাদের উষ্ণভাবে গ্রহণ করেছিল সন্দ্বীপবাসী।

১৬০৫ সালে আফগান ফতেহ খান পুর্তগীজদের সন্দ্বীপ ছাড়া করে; এই সময় ফতেহ খান পুর্তগীজদের পাইকারী হারে হত্যা করে।
দুই বছর পর ১৬০৭ সালে সেবাস্টিয়ান গঞ্জালেস টিবাউয়ের নেতৃত্বে চার শতাধিক পুর্তগীজ সন্দ্বীপ পুনরায় হস্তগত করে।
সন্দ্বীপ পুনরায় বিজয় করা বাদে চট্টগ্রাম অঞ্চলে এই বছরটা পুর্তগীজদের জন্য খুব খারাপ কেটেছিল, চট্টগ্রাম বন্দর অঞ্চল দিয়াঙ্গাতে আরাকানীরা প্রায় ছয় শতাধিক পুর্তগীজদের হত্যা করে, ১৬১৫ সালের আগে দিয়াঙ্গাতে পুর্তগীজরা ফিরতে পারেনি।

সেবাস্টিয়ান গঞ্জালেস টিবাউয়ের শাসনামল ছিল সন্দ্বীপে পুর্তগীজদের স্বর্ণযুগ।
টিবাউয়ের নেতৃত্বে সন্দ্বীপ হয়ে উঠে স্বাধীন পুর্তগীজ রাজ্য।
এই সময় টিবাউ বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করে; দখল করে দক্ষিন শাহবাজপুর ও পাটেলভাঙ্গা।
পুর্তগীজরা সন্দ্বীপ থেকে প্রতিবছর ৩০০ লবণ বোঝাই জাহাজ ইংল্যান্ডের লিভারপুলে প্রেরণ করতো।
লবণ শিল্পের পাশাপাশি এই সময় সন্দ্বীপ জাহাজ-নির্মাণ শিল্পের জন্যও বিখ্যাত হয়ে উঠে।

১৬১৫ সালে টিবাউ আরাকান আক্রমনের প্রস্তুতি নেয়; এই অভিযানের পিছনে ১৬০৭ সালে দিয়াঙ্গাতে আরাকানীদের হাতে পুর্তগীজদের গণহত্যার ঘটনা মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করছিল।
১৬১৫ সালের অক্টোবরে পুর্তগীজরা আরাকানীদের আক্রমন করে এবং বিজয়ী হয় কিন্তু এই বিজয় বেশিদিন উপভোগ করতে পারেনি টিবাউ বা পুর্তগীজরা।
পরের বছর ১৬১৬ সালে আরাকানীরা মুঘল নৌবাহিনীর অফিসার দেলোয়ার খানের নেতৃত্বে সন্দ্বীপ আক্রমন করে এবং পুর্তগীজদের সন্দ্বীপ হতে বিতাড়িত করে।
আর এর সাথে শেষ হয় সন্দ্বীপে পুর্তগীজদের রাজত্ব।

দেলোয়ার খান মুঘল অফিসার হলেও শাসক হবার অভিপ্রায়ে মুঘল নৌবাহিনী ত্যাগ করেছিল এবং আরাকান রাজের বশ্যতা স্বীকার করে স্বাধীনভাবেই পরবর্তী পঞ্চাশ বছর সন্দ্বীপ শাসন করে।

আজকের পর্ব এই পর্যন্ত...
সন্দ্বীপের ইতিহাসে ডোমিঙ্গো কারভেলো, সেবাস্টিয়ান গঞ্জালেস টিবাউ, ফতেহ খান, দেলোয়ার খান সহ পর্তুগীজ ও অন্যান্যদের রোমাঞ্চকর ঘটনাগুলো নিয়ে পরবর্তীতে লেখার ইচ্ছে রইল।



মানচিত্রের ছবি:

১. মার্কো র‍্যামরিনি
২. জে. ভ্যান ব্র্যাম (১৭২৪)

সূত্র:

০১. কলোনিয়াল ভয়েজ
০২. বাংলাপিডিয়া।
০৩. The Sundarbans of India : a development analysis - Asim Kumar Mandal.
০৪. তন্ময় ভট্টাচার্যের সংকলিত Modern Bengal.

লেখকঃ সাব্বির হোসাইন
sabbir.hossain.office@gmail.com
সমন্বয়ক, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার ও গবেষনা কেন্দ্র।

More News

Warning: file_get_contents(http://www.sandwipnews24.com/temp/.php): failed to open stream: HTTP request failed! HTTP/1.1 404 Not Found in /home/sandwipnews/public_html/m/news_details.php on line 77

Warning: Invalid argument supplied for foreach() in /home/sandwipnews/public_html/m/news_details.php on line 79