'সর্জন পদ্ধতি'র কৃষিঃ নোনা চরে সফল

'সর্জন পদ্ধতি'র কৃষিঃ নোনা চরে সফল

নালায় মাছ, মাচায় হরেক রকমের সবজি, উঠানে গবাদি পশু--- এ যেন সবুজে মোড়ানো সমৃদ্ধ কোনো গ্রাম। অথচ কয়েক দশক আগেও এ চর ছিল জনবসতিশূন্য। এখন এ চরে অনেকেই বসবাস করছেন এবং স্বাবলম্বীও সকলে। এ চিত্র নোয়খালী জেলার মেঘনা নদীতীরবর্তী সুবর্ণচরের। এখানকার কৃষকরা ‘সর্জন’ নামের এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে নিজেদের ভাগ্য ফেরাতে সক্ষম হয়েছেন। নদীভাঙ্গনে ঘরবাড়ি হারানো মানুষগুলো অন্য চর থেকে এসে এ চরে নিজেদের স্বপ্নের ঠাঁই গেড়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলের সহায় সম্বলহীন, নদীভাঙ্গা দরিদ্র মানুষগুলোকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখায় ‘সর্জন’ নামের কৃষির এ পদ্ধতি।
স্থানীয় চরভাটা ইউনিয়নের কৃষক ছমির উদ্দিনের সাথে কথা বলে জানা যায়, বন্যা, খরা,  লবণাক্ততা, জলবদ্ধতার কারণে সুবর্ণচর উপজেলায় হাজার হাজার হেক্টর ভূমি অনাবাদী পড়ে থাকত। কিন্তু এখন আর তা হয় না। সর্জন পদ্ধতির সুবাদে এক চিলতে জমিও আর অনাবাদী থাকে না। এ পদ্ধতিতে সারা বছরজুড়ে মাছ ও সবজি একসঙ্গে চাষ করে লাভবান হচ্ছেন এ অঞ্চলের কৃষক।
মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, সুবর্ণচর উপকূলীয় উপজেলা হওয়ায় এখানকার প্রায় সব জমিই লবণাক্ত। মেঘনা নদী কাছাকাছি থাকায় জোয়ার, বন্যা, খরা, জলাবদ্ধতায় হাজার একর ভূমি অনাবাদী পড়ে থাকত। ফলে কৃষকদের ভূমি থাকলেও তারা ফসল পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতেন। 


উপজেলার চরভাটা ইউনিয়নের চর মজিদ এলাকায় গিয়ে কথা হয় কথা হয় আমিনুলইসলাম নামের এক কৃষকের সাথে। তিনি জানান, প্রথমে ২ একর অনাবাদী জমি দিয়ে তিনি এ চাষাবাদ শুরু করেন। মাটি কেটে নালা করে সেখানে মাছ, সেই নালার পাড়ে মাচায় সবজি এবং বাকি খালি জায়গায় গরু-ছাগল পালন করছেন। 
তিনি জানান, তার এ প্রকল্প থেকে প্রতিবছর প্রায় লাখ টাকার মত আয় হয়। যা দিয়ে ভালোভাবেই তার সংসার চলে যায়।  
শুধু শফিউল নন, এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে এ গ্রামে সফল হয়েছেন সখিনা খাতুন, মজিদ মিয়া, সেলিম হোসেন সহ আরো অনেকেই। 
সফল চাষী হারুন মিয়া  জানান, এ পদ্ধতিতে সবজি ও মাছ উভয় একসঙ্গে সারা বছর চাষ করে লাভবান হচ্ছেন তিনি। সর্জন পদ্ধতিতে চাষ সম্পর্কে তিনি জানান, প্রথমে ভূমি  থেকে মাটি কেটে উঁচু করে আড়া বাঁধা হয়। আড়ার ফাঁকে নালা তেরি করা হয়। পরে আড়ার ওপর শশা, বরবটি, করলা,পেঁপে, পটল, শিমসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করা হয়। আর নালাতে বিভিন্ন জাতের মাছ চাষ করা হয়। 
এ পদ্ধতির ফলে বর্ষা মৌসুমে পানিতে আড়া ডুবাতে পারে না অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে নালায় থাকা পানি সবজি চাষে ব্যবহৃত হয়। এ পদ্ধতিতে চাষ করে লাভবান হচ্ছে কৃষক। অনাবাদি জমি পরিণত হচ্ছে আবাদি জমিতে।


এ পদ্ধতির চাষাবাদ নিয়ে কথা হয় উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্মকর্তা হারুন অর রশিদের সাথে। তিনি জানান, পদ্ধতিটি অবলম্বন করে সুবর্ণচরের শত শত কৃষক তাদের জীবিকা নির্বাহ করছেন। ২০০৮ সালে সর্বপ্রথম কিছু কৃষক এ চাষাবাদ শুরু করেন। এখন তা পুরো উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। এটি যদি নোনা পানির অন্য চরগুলোতেও করা হয় তাহলে সেখানেও সাফল্য পাবে কৃষক। 
তিনি বলেন, ‘সর্জন’ হচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার একজন ব্যক্তির নাম। তিনি প্রথম তার দেশে এ পদ্ধতিতে চাষ শরু করে সফল হন, তাই তার নামানুসারে এ চাষপদ্ধতির নাম হয় ‘সর্জন পদ্ধতি’। বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ পদ্ধতি ব্যবহার হচ্ছে।


কৃষির এ পদ্ধতি অবলম্বন করেই নদীভাঙ্গনের শিকার মানুষ এসে বসত গড়ে তুলছেন নোনা পানির সাম্রাজ্যে। এ অঞ্চলের সফল কৃষকরা মনে করছেন এ পদ্ধতিটি যদি সুবর্ণচরের মত উপকূলের অন্য এলাকাতেও প্রয়োগ করা হয়, তাহলে সেখানেও সাফল্য পাওয়া যাবে, কৃষিতে ঘটবে বিপ্লব। ভাগ্য ফিরবে চরের কৃষকদের।

More News

Warning: file_get_contents(http://www.sandwipnews24.com/temp/.php): failed to open stream: HTTP request failed! HTTP/1.1 404 Not Found in /home/sandwipnews/public_html/m/news_details.php on line 77

Warning: Invalid argument supplied for foreach() in /home/sandwipnews/public_html/m/news_details.php on line 79