জুমের ফলনে বুক জুড়ায়

জুমের ফলনে বুক জুড়ায়

‘হিল্লো মিলেবো জুমত যায় দে, জুমত যায় দে, যাদে যাদে পধত্তুন পিছ্যা ফিরি রিনি চায়, শস্য ফুলুন দেঘিনে বুক্কো তার জুড়ায়...।


এটি চাকমা সম্প্রদায়ের প্রিয় একটি গান। সারা বছর পরিশ্রম শেষে পাহাড়িরা যখন জুমক্ষেতের পাকা ফসল ঘরে তুলতে যায়, তখন জুম ঘরের মাচায় বসে মনের আনন্দে গানটি গায়। এ গানের বাংলা অর্থ হলো: পাহাড়ি মেয়েটি জুমে যায় রে, যেতে যেতে পথে পথে পেছন ফিরে চায়, পাকা শস্য দেখে তার বুকটা জুড়ায়।’


পাহাড়ে জুম ক্ষেতে এখন পাকা ফসল তোলার ভরা মৌসুম। তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, ও বান্দবানের পাহাড়ি জুমক্ষেতে শুরু হয়েছে পাকা ধান কাটা। ধুম পড়েছে মারফা (পাহাড়ি শশা), চিনারগুলা (পাহাড়ি মিষ্টিফল),বেগুন, ধানি মরিচ, ঢেঁড়শ, কাকরল, কুমড়া ইত্যাদি ফসল তোলার কাজ। এরপর ঘরে উঠবে তিল, যব। সব শেষে তোলা হবে তুলা।


জুমক্ষেতে গিয়ে দেখা যায়, জুম্ম নারীরা পাকা ধান কাটায় ব্যস্ত। তারা জানালেন, জুমে এবার ভালো ফলন হয়েছে। অনেকের ঘরে উঠেছে পরিশ্রমের সেই সোনালি ফসল। সোনালি ফসল ঘরে আনতে পারায় তাদের মুখে হাসি ফুটেছে। চোখে-মুখে আশার আলো। এই সময়ে কিছু কিছু জুমিয়া ঘরে নবান্ন্‌ উৎসবের আয়োজন শুরু করে।


জুমচাষিরা জানান, পৌষ-মাঘ মাসে জুমচাষিরা পাহাড়ের ঢালে জঙ্গল পরিষ্কার করা হয়। শুকানোর পর ফাল্গুন-চৈত্র মাসে আগুনে পুড়িয়ে তারা জুমক্ষেত প্রস্তুত করেন। এরপর বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে পোড়া জুমের মাটিতে শুচালো দা দিয়ে গর্ত খুঁড়ে একসঙ্গে ধান, তুলা, তিল, কাউন, ভুট্টা, ফুটি, চিনার, যব ইত্যাদি বীজ বপন করেন। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে জুমের ফসল পাওয়া শুরু হয়। সে সময় মারফা, কাঁচা মরিচ, চিনার ও ভুট্টা পাওয়া যায়। ধান পাকে ভাদ্র-আশ্বিন মাসে। সব শেষে কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে তুলা, তিল ও যব ঘরে তোলা হয়।


এ বছর রাঙামাটিসহ পার্বত্য তিনটি জেলার পাহাড়ে জুমের ভালো ফলন হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। রাঙামাটি সদর উপজেলার বরাদম ইউনিয়নের গোলাছড়ি এলাকার সতীশা চাকমা জানিয়েছেন, এবার তার জুমের ফলন ভালো হয়েছে।


রাঙামাটি সদরের মগবান ইউনিয়নের বৌদ্ধ চাকমা তার জুমের ফসল কাটতে কাটতে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলেন, এবার আমার জুম থেকে ভালো ধান পাব বলে আশা করছি। তিনি পাশাপাশি হলুদও রোপণ করেছেন।


মগবান ইউনিয়নের আরেক জুমচাষি ননাবি তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, দেড় একরের মতো জায়গায় জুমচাষ করেছি। এ জুমে উৎপাদিত ফসল দিয়ে আগামী ৭-৮ মাস পর্যন্ত আমার চলে যাবে। এখান থেকে বেশ কিছু অর্থ উপার্জন হবে।


সদর উপজেলার শুকরছড়ি এলাকার জুমচাষি দীপা জানান, জুমের ফসল ভালো হয়েছে। ভবিষ্যতে যদি কৃষিবিভাগের কাছ থেকে কিছু সহযোগিতা পাই, তাহলে আমরা ধান ও অন্যান্য ফসল ভালোভাবে রোপণ করতে পারব। এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় জুমের ধান ভালো হয়েছে।


রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক রমণী কান্তি চাকমা বলেন, জুম চাষ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগ মানুষ জুম চাষকে কেন্দ্র করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। জুমিয়ারা সাধারণত পাহাড়ে গেলক, বাধিয়া, কবরক, ছুড়ি, বিন্নি জাতের ধানের চাষ করে থাকে। তাছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ জুম চাষ পদ্ধতিতে কিছু আধুনিক ধানের চাষ প্রচলন করেছে।


তিনি জানান, এ বছর ৬ হাজার ৫০ হেক্টর জুম চাষের আবাদ হয়েছে। যেসব পাহাড়ে জমির উর্বরতা ভালো, সেসব জায়গায় জুম চাষ ভালো হয়েছে।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী জুম চাষ পদ্ধতির আধুনিকায়ন প্রয়োজন। এছাড়া জুমচাষিদের জন্য প্রয়োজন ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা। এতে এ অঞ্চলের খাদ্যর ঘাটতি পূরণ হবে। তাদের জীবনমানও বৃদ্ধি পাবে।


 

More News

Warning: file_get_contents(http://www.sandwipnews24.com/temp/.php): failed to open stream: HTTP request failed! HTTP/1.1 404 Not Found in /home/sandwipnews/public_html/m/news_details.php on line 77

Warning: Invalid argument supplied for foreach() in /home/sandwipnews/public_html/m/news_details.php on line 79