রাজধানীর অন্যতম বাস টার্মিনাল সায়েদাবাদে প্রতিদিন চলে কোটি টাকার চাঁদাবাজি

রাজধানীর অন্যতম বাস টার্মিনাল সায়েদাবাদে প্রতিদিন চলে কোটি টাকার চাঁদাবাজি

খেপুপাড়া নিউজ২৪কম : রাজধানীর অন্যতম বাস টার্মিনাল সায়েদাবাদে প্রতিদিন চলে কোটি টাকার চাঁদাবাজি। রমজান শুরু হতেই এই চাঁদাবাজির পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। যে যার মতো ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে শ্রমিক নেতা সেজে এই চাঁদাবাজি করছে। যানবাহন মালিক-চালকেরাও বাধ্য হচ্ছেন চাঁদা দিতে। চাঁদার টাকা না দিলেই পড়তে হয় হয়রানিতে। মারধর, বাস আটকিয়ে রাখা, চাকা ফুটো করে দেয়াসহ নানা অত্যাচার চলে। প্রকাশ্যে এমন চাঁদাবাজি চললেও যেন দেখার কেউ নেই। বরং স্থানীয় এমপি থেকে শুরু করে সরকার দলীয় নেতাকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছেও এই টাকার ভাগ চলে যায়। সরজমিন সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে।
সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে গাজীপুর, সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও নোয়াখালীর প্রধান ৫টিসহ প্রায় ৩২টি রুটে গাড়ি চলাচল করে। এই ৩২টি রুটের যানবাহনের কাছ থেকে চাঁদাবাজিতে ৫টি গ্রুপ সক্রিয়। প্রতিটি গ্রুপ নিজ নিজ উদ্যোগে সমিতি খুলে ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদার টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করছে। মাসে প্রায় কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়।
গতকাল সরজমিন সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, সেখানকার মূল ভবনের দোতলায় দুটি ইউনিয়নের অফিস। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত একটি সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে মালিক সমিতি অপরটি সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল শ্রমিক সমিতি। দু'টি সমিতির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। একে অপরকে সহ্য করতে পারে না। প্রতিটি জাতীয় ও শ্রমিক দিবসে দু'টি সমিতি আলাদা আলাদা কর্মসূচির আয়োজন করে থাকেন। প্রায় সময় মারামারিতেও লিপ্ত হন তারা। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে খুনোখুনির ঘটনাও ঘটেছে। কয়েক মাস আগে সায়েদাবাদ পরিবহন শ্রমিক ও স্থানীয় যুবলীগ নেতা খাইরুল ইসলাম খুন হন এই চাঁদাবাজির টাকা ভাগ-বাটোয়ারা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই। এছাড়া গত শনিবার রাতে মতিঝিলের টিএন্ডটি কলোনি এলাকায় ডিবি পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত রমজান আলী জাবেদ ওরফে রমজান ডাকাতকেও চাঁদাবাজি টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে ডিবি পুলিশ দিয়ে খুন করানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রমজান সায়েদাবাদ থেকে দাউদকান্দি ও হোমনা রুটের প্রধান লাইনম্যান ছিলেন।
সূত্র জানায়, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে ৩২টি রুটে প্রতিদিন প্রায় ৬০০-৭০০ বাস ছেড়ে যায়। এর মধ্যে প্রধান ৫টি রুট গাজীপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা ও নোয়াখালীতে কয়েক শ' বাস চলাচল করে। এই ৫টি রুট নিয়ন্ত্রণ করে সায়েদাবাদ বাস মালিক ও শ্রমিক সমিতি। মালিক সমিতি ৩টি ও শ্রমিক সমিতি ২টি রুট নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। প্রতিটি রুটে লাইনম্যান রয়েছে। রাস্তার গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বা বিভিন্ন স্ট্যান্ডের পাশে কুঁড়েঘর তুলে ওই গ্রুপগুলোর লোকজন বসে।
যারা রুট নিয়ন্ত্রণ করে থাকে তারা বিলাসবহুল বাস থেকে প্রতিদিন ৫০০ টাকা ও লোকাল বাস থেকে প্রতিদিন ১০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করে। ওই টাকা বিভিন্ন সমিতি, ইউনিয়ন, সিটি করপোরেশন, ফেডারেল প্রতিষ্ঠান ও পুলিশের কাছে যায়। টাকা না দিলে রাস্তায় বাস চালানো যায় না। সমিতির নেতাকর্মী ও ক্যাডাররা দল বেঁধে গাড়ির লোকজনের ওপর হামলা চালায়। কখনও গাড়ির স্টাফদের মারধর করে। কখনও গাড়ি ভাঙচুর করে। রাস্তায় গাড়ি আটকিয়ে রাখে। চাকা ফুটো করে দেয়। হয়রানি এড়াতে বাসের সামনে লাইনম্যান এলেই সবাই টাকা দিয়ে দেয়।
সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে ছেড়ে যাওয়া চৌদ্দগ্রাম ট্রান্সপোর্ট প্রা. লি.-এর সুমাইয়া পরিবহনের চালক মো. মিলন বলেন, প্রতিদিন বিভিন্ন সমিতি, ইউনিয়ন, সিটি করপোরেশন, ফেডারেল প্রতিষ্ঠান, পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের চাঁদা দিতে হয়। না দিলে গাড়ি চালাতে দেয় না। গাজীপুরের ৩২ রুটে চলাচলকারী লাবু এন্টারপ্রাইজের বলাকা স্পেশাল সার্ভিসের চালক আমীর হোসেন জানান, পাঁচ বছর ধরে গাড়ি চালাই। রাস্তায় গাড়ি নিয়ে নামলেই লাইনম্যানদেরকে টাকা দেয়া লাগে। যারা লাইনম্যান তাদেরকে ব্যক্তিগত ভাবে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আমাদের পরিশ্রমের টাকা কেন দিবো? উত্তরে তারা বলেছে, বাস মালিক সমিতির নেতাদের দিতে হবে। তারা মালিক ও শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করে থাকে। সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল শ্রমিক কমিটির দপ্তর সম্পাদক মঞ্জুর মোর্শেদ মঞ্জু জানান, এই কমিটির সদস্যরা মালিক ও শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে থাকে। তারা নিজের পকেটের টাকা খরচ করে নির্বাচন করে কারও তাঁবেদারি করে না। টার্মিনাল কেন্দ্রিক কোন চাঁদাবাজি হয় কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি অস্বীকার করেন।
তবে তিনি স্বীকার করেন, ৫টি প্রধান রুটের মধ্যে সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল শ্রমিক কমিটির একটি অংশ হোমনা ও দাউদকান্দি রুটটি নিয়ন্ত্রণ করতেন। ওই রুটের সভাপতি ছিলেন খাইরুল ইসলাম খায়ের। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন রমজান আলী জাবেদ। রমজান ওই রুটের প্রধান লাইনম্যান ছিলেন। রুটের টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। এখন শুনছি খাইরুল ডিবি পুলিশকে ভাড়া করে জাবেদকে হত্যা করিয়েছে।
তবে ওই কার্যকরী কমিটির এক সদস্য মানবজমিনকে জানান, দুই কমিটির নেতা হওয়ার জন্য ইউনিয়নের নির্বাচনে লাখ লাখ টাকা খরচ করে থাকে। উদ্দেশ্য একটাই, যে প্রধান ৫টি রুট আছে ওই ৫টি রুটের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং সেখান থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা তোলা। তিনি আরও বলেন, এই দু'টি ইউনিয়নের ওপর একক প্রভাব রয়েছে স্থানীয় এমপির। ৫টি রুটে প্রতি মাসে ৫০ লাখ টাকা লাইনম্যানরা উঠিয়ে থাকেন। বার্ষিক টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬ কোটি টাকা। ৫টি গ্রুপের লাইনম্যানেরা প্রধান রুট থেকে এই টাকা উঠিয়ে থাকেন। এটি শুধু প্রধান রুটের হিসাব।
সরজমিন দেখা যায়, সানারপাড়ের বাসস্ট্যান্ডের রাস্তার পাশে একটি ছোট টিনের ঘরে বসে আছেন রহমান ও সাদেক নামের দুই যুবক। তারা ওই রুটের প্রতিটি যাত্রীবাহী বাস থেকে ১০০ থেকে ৫০০ টাকা করে ওঠাচ্ছেন। টাকা ওঠানোর বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তারা এই প্রতিবেদকের কাছে পরিচয় জানতে চান। পরিচয় জেনে কথা বলতে রাজি হচ্ছিলেন না। পরে অন্য একজন জানান, এখানে আমরা লাইনম্যানের কাজ করে থাকি। এই টাকা সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল মালিক সমিতির কাছে যায়। তারা আমাদের কেন টাকা তোলায় তাদের কাছে বিষয়টি জানেন। গাজীপুরের রুটের প্রধান লাইনম্যান আব্দুর রশিদ জানান, আমি সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল শ্রমিক কমিটির সদস্য। গত বছর নির্বাচনে বিপুল টাকা খরচ করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বর্তমান কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। এরপরই এই রুটের টাকা ওঠানোর দায়িত্ব পাই। এ টাকা কার কাছে যায় প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, উপর থেকে নিচু লেবেল পর্যন্ত এ টাকার ভাগ সবার কাছে যায়। যোগাযোগ করা হলে সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ এ বিষয়ে কোন কথা বলতে রাজি হননি।
তবে ওই কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাজী আবেদ আলী জানান, টার্মিনাল উন্নয়ন, আহত ও নিহত শ্রমিকদের জন্য ফান্ডের জন্য লাইনম্যানেরা টাকা ওঠায়। ওই টাকা সমিতির ফান্ডে আসে। কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। এই টাকা ওঠানো বৈধ না অবৈধ প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, টার্মিনাল থেকে ওঠালে ওই টাকা বৈধ। আর রাস্তা থেকে ওঠালে ওই টাকা অবৈধ। লাইনম্যানের টাকা সমিতির কাছে যায় বলে যে অভিযোগ পাওয়া যায় এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, কোন অবৈধ টাকা আমরা গ্রহণ করি না। তবে জানা গেছে, সমিতির কোন কল্যাণ তহবিল নেই।
জানতে চাইলে সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল শ্রমিক কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আলী শোভা রুটের টাকা তোলার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, বাস মালিক সমিতি প্রধান পাঁচটি রুটে তাদের লাইনম্যান দিয়ে টাকা ওঠায়। এ টাকার সঙ্গে শ্রমিক ইউনিয়নের কোন সম্পর্ক নেই। এ বিষয়ে তিনি আর কোন কথা বলতে রাজি হননি তিনি। খাইরুল ও জাবেদের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শ্রমিক নেতা সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হয়েছেন আর জাবেদ রুটের টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে নিহত হয়েছেন। এরা পরিবহন শ্রমিক নেতা হলেও তাদের সঙ্গে মূল কমিটির কোন যোগাযোগ ছিল না বলে তিনি দাবি করেন।
যাত্রাবাড়ী থানার ওসি অবনী শংকর রায় বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ বাস টার্মিনাল সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল। এটি যাত্রাবাড়ী থানার অধীনে। সেখানে যেন কোন অপরাধ না ঘটে এ জন্য পুলিশ সতর্ক থাকে। এই টার্মিনালের রুট ভিত্তিক চাঁদার টাকা যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশের কাছে যায় কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কারা চাঁদা ওঠায় পুলিশ তাদেরকে চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।

More News

Warning: file_get_contents(http://www.sandwipnews24.com/temp/.php): failed to open stream: HTTP request failed! HTTP/1.1 404 Not Found in /home/sandwipnews/public_html/m/news_details.php on line 77

Warning: Invalid argument supplied for foreach() in /home/sandwipnews/public_html/m/news_details.php on line 79