সালামের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

সালামের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

অধ্যাপক হাসান আবদুল : :  আরবীতে সালাম শব্দের অর্থ শান্তি। সালাম প্রধানত পারস্পরিক কল্যাণ ও শান্তি কামনার অভিবাদন হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়েছে। কুরআন মজিদে ইরশাদ হয়েছে : ফাকুল সালামুন আলায়কুম কাতাবা রব্বুকুম আলা নাফসিহির রহমাত- অতএব তাদের তুমি বলবে তোমাদের ওপর বর্ষিত হোক শান্তি। তোমাদের রব্ দয়া করা তাঁর কর্তব্য বলে স্থির করেছেন। (সূরা আন্ আম : আয়াত ৫৪)।


অভিবাদন হিসেবে সালামের বাক্যটি হচ্ছে আস্সালামু ‘আলায়কুম- তোমাদের ওপর বর্ষিত হোক শান্তি। এর জবাবে বলতে হয়- ওয়া আলায়কুমুস্ সালাম- তোমাদের ওপরও বর্ষিত হোক শান্তি। সালাম দেয়াটা হচ্ছে সুন্নত এবং তার উত্তর অর্থাৎ ওয়া আলায়কুমুস্ সালাম বলাটা ওয়াজিব।


ইসলাম যে পারস্পরিক অভিবাদন রীতি প্রদান করেছে তা পারস্পরিক শান্তি কামনার মধ্য দিয়ে মানবিক মূল্যবোধকে বুলন্দ করে দেয় এবং সর্বপর্যায়ে শান্তি ও সম্প্রীতি স্থাপনের পথ সুগম করে দেয়।


আসসালামু আলায়কুম এবং ওয়া আলায়কুমুস সালাম বলার মধ্যে প্রচুর সওয়াব যেমন রয়েছে তেমনি তার সঙ্গে রহমাতুল্লাহি ও বারাকাতুহু যোগ করে বলার মধ্যে সওয়াব আরও কয়েকগুণ বেশি লাভ করা যায়।


প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লালাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বেশি বেশি সালাম প্রবর্তনের তাকিদ দিয়েছেন।


হযরত আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত রসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : যখন তোমাদের পরস্পর সাক্ষাত হয় তখন তোমাদের মধ্যে সালাম বিনিময় করা কর্তব্য। যদি কোন বৃক্ষ, প্রাচীর বা শিলাখ- দু’জনার মধ্যে আড়াল করে দেয়ার পর আবার আড়াল থেকে পরস্পর মুখোমুখি হলেই আবার সালাম বিনিময় করা বাঞ্ছনীয়। (আবু দাউদ শরীফ)। এই হাদিসখানি থেকে সালাম বিনিময়ের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে যায়।


সালাম বিনিময়ের মধ্য দিয়ে মানুষে মানুষে বিভেদের যে প্রবণতা তা দূরীভূত হয়। প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : যে প্রথমে সালাম দেয় সে অহঙ্কারমুক্ত হয়ে যায়। (বায়হাকী)।


কুরআন মজিদে সালাম শব্দটি নানাভাবে এসেছে। কারও গৃহে প্রবেশের আগে বাইরে থেকে সালাম দেয়ার নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ হয়েছে : ইয়া আইয়ুহাল্লাযীনা আমানু লা তাদখুলু বুয়ুতান গায়রা বুয়ুতিকুম্ হাত্তা তাস্তানিসূ ওয়া তুসাল্লিমূ আলা আহলিকা, যালিকুম খায়রুল্ লাকুম লা আল্লাকুম তাযাক্কারূন- ওহে তোমরা যারা ইমান এনেছ! তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্য কারও গৃহে গৃহবাসীদের অনুমতি না নিয়ে এবং তাদের সালাম না করে প্রবেশ করবে না। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। (সূরা নূর, আয়াত-২৭)।


আরও ইরশাদ হয়েছে : ফা ইযা দাখাল্তুম বুয়ুতান্ ফাসাল্লিমূ আলা আনফুসিকুম্ তাহিয়্যাতাম্ মিন্ ইনদিল্লাহি মুবারাকাতান্ তয়্যিবাতান, কাযালিকা ইউবাইনুল্লাহু লাকুমুল আয়াতি লা’আললাকুম্ তা’তাকিলুন- অতএব যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করবে তখন তোমরা তোমাদের স্বজনদের প্রতি সালাম করবে অভিবাদনস্বরূপ যা আল্লাহর নিকট হতে কল্যাণময় ও পবিত্র। এভাবে আল্লাহ্ তোমাদের জন্য তাঁর নির্দেশ বিশদভাবে বিবৃত করেন যাতে তোমরা বুঝে উঠতে পার। (সূরা নূর : আয়াত ৬১)। পরস্পর এই সালাম দেয়ার ও নেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ একটি নীতিমালা প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম স্থির করে দিয়েছেন।


প্রথমে কে বা কারা সালাম দেবে সে সম্পর্কে হযরত আবু হোরায়রা রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হু থেকেই বর্ণিত আছে যে, হযরত রসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : আরোহী পথচারীকে, পথচারী উপবিষ্টকে এবং ছোট দল বড় দলকে সালাম দেবে। (বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ)।


এখানে উল্লেখ্য যে, ইসলাম শব্দের শব্দমূল হচ্ছে সলম বা সালাম যার অর্থই শান্তি। পৃথিবীতে যারা এই শান্তির ওপর কায়েম থাকবে এবং শান্তি কায়েম করায় সচেষ্ট থাকবে তাদের জন্য আখিরাতে যে বসবাস স্থল নির্ধারিত রয়েছে তার নাম দারুস্ সালাম অর্থাৎ শান্তিনিকেতন। কুরআন মজিদে ইরশাদ হয়েছে : ওয়া আল্লাহু ইয়াদ‘ঊ ইলা দারিস্ সালাম, ওয়া ইয়াহ্দী মাইয়াশাউ ইলা সিরাতিম্ মুসতাকিম- আল্লাহ্ দারুস্ সালামের দিকে আহ্বান করেন এবং যাকে ইচ্ছে সরল পথে পরিচালিত করেন। (সূরা ইউনুস : আয়াত ২৫)। আরও ইরশাদ হয়েছে : লাহুম দারুস্ সালামি ইন্দা রব্বিহিম্- তাদের রবের নিকট তাদের জন্য রয়েছে দারুস্ সালাম। (সূরা আন‘আম : আয়াত ১২৭)।


জান্নাতে দাখিল হওয়ার সময় যে অভ্যর্থনা জানানো হবে সেই অভ্যর্থনায় সম্ভাষণ বাক্য হবে সালাম সালাম। কুরআন মজিদে ইরশাদ হয়েছে : সালামুন, কাওলাম্ মিররব্বির রহীম- সালাম, পরম দয়ালু রবের পক্ষ থেকে সম্ভাষণ। (সূরা ইয়াসীন : আয়াত ৫৮), তাহিয়্যাতুহুম ফীহা সালামুন- সেখানে তাদের অভিবাদন হবে সালাম। (সূরা ইব্রাহীম : আয়াত ২৩, সূরা ইউনুস : আয়াত ১০, সূরা আহযাব : আয়াত ৪৪)। আরও ইরশাদ হয়েছে : ইন্নাল মুত্তাকীনা ফী জান্নাতিউ ওয়া‘উইউন, উদখুলুহা বি সালামিন্ আমিনীন- মুত্তাকীরা থাকবে জান্নাতে ও প্রসবনসমূহের মধ্যে। তাদের বলা হবে সালাম ও নিরাপত্তার সঙ্গে ওতে প্রবেশ কর (সূরা হিজর : আয়াত ৪৫-৪৬), তাদের বলা হবে সালাম (শান্তির সঙ্গে তোমরা ওতে প্রবেশ কর। এটা অনন্ত জীবনের দিন। (সূরা কাফ : আয়াত ৩৪)।


আমরা সালাত আদায়ের সময় যে তাশাহ্হূদ বা আত্তাহিয়্যাতু বৈঠকে পাঠ করি তাতেও এই সালামের উল্লেখ রয়েছে। অনেকের মতে, এই সালাম বিনিময় হয়েছিল মিরাজকালে আল্লাহর সঙ্গে প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ মুস্তাফা আহমদ মুজ্তাবা সাল্লাল্লাহ আলায়হি ওয়া সাল্লামের আর তা হচ্ছে : আসুসালামু আলায়কা আইয়ুহান্নাবিউ ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু, আস্সালামু আলায়না ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস্ সালিহীন- হে নবী! আপনার ওপর বর্ষিত হোক সালাম ও আল্লাহর রহমত এবং তাঁর বরকত। সালাম বর্ষিত হোক আমাদের ওপর এবং আল্লাহর নেক বান্দাগণের ওপর।


আমরা সালাতের সমাপ্তিকালে ডানের কাঁধ বরাবর মুখ ফিরিয়ে যে সালাম করি এবং বামের কাঁধ বরাবর মুখ ফিরিয়ে যে সালাম করি সেটা হচ্ছে আস্সালামু ‘আলায়কুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।


প্রতিটি ক্ষেত্রেই সালাম বা শান্তি কামনার এই যে বিধান ইসলাম দিয়েছে মানব সভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাসে এর দৃষ্টান্ত দ্বিতীয়টি নেই। এমনকি কবর জিয়ারত করার সময় প্রথমেই কবরবাসীর উদ্দেশে যে সালাম জানাতে হয় তা হচ্ছে : আস্সালামু আলায়কুম ইয়া আহলাল কুবূর- হে কবরের বাসিন্দাগণ! তোমাদের ওপর বর্ষিত হোক শান্তি (সালাম)।


প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রতি সালাত (দরুদ) এবং যথাযথ সম্মানের সঙ্গে সালাম জানানোর নির্দেশ আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু প্রদান করেছেন। ইরশাদ হয়েছে : ইন্নাল্লাহা ওয়া মালাইকাতাহু ইউসল্লুনা আলান্ নাবী, ইয়া আইউহাল্লাযীনা আমানূ সল্লু আলায়হি ওয়া সাল্লিম তাসলিমা- নিশ্চয়ই আল্লাহ এবং তাঁর ফেরেশ্তাগণ নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন। ওহে তোমরা যারা ইমান এনেছ! তোমরাও নবীর প্রতি দরুদ পেশ কর এবং তাঁকে যথাযথ সম্মানের সঙ্গে সালাম জানাও। (সূরা আহ্যাব : আয়াত ৫৬)।


এই আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে মিলাদ মাহফিল প্রবর্তিত হয়েছে এবং যথাযথ সম্মানের সঙ্গে সালাম জানাও- আল্লাহর এই নির্দেশ পালন করার উদ্দেশ্যে মিলাদ মাহফিলে এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে মধুর স্বরে এবং বিনয়ের সঙ্গে উচ্চারিত হয়; ইয়া নবী সালামু আলায়কা, ইয়া রসূল সালামু আলায়কা, ইয়া হাবীব সালামু আলায়কা, সালাওয়া তুল্লাহি আলায়কা।


সূরা সাফ্ফাতের ৭৯ নম্বর আয়াতে হযরত নূহ আলায়হিস্ সালামের প্রতি, ১০৯ নম্বর আয়াতে হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালামের প্রতি, ১২০ নম্বর আয়াতে হযরত মূসা আলায়হিস্ সালাম ও হারুন আলায়হিস্ সালামের প্রতি, ১৩০ নম্বর আয়াতে হযরত ইলয়াসিন (ইলয়াস) আলায়হিস সালামের প্রতি, ১৮০ নম্বর আয়াতে সমস্ত রসুলের প্রতি সালাম বর্ষণের উল্লেখ রয়েছে।


প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লালাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যারা সালামের ব্যাপারে কার্পণ্য করে তাদের দারুণ কৃপণ বলেছেন। (আহমদ, বায়হাকী)।


বায়হাকীতে বিধৃত আর একখানি হাসিদে আছে যে প্রিয় নবী সাল্লালাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : তোমরা যখন কারও গৃহে প্রবেশ করবে তখন সেই গৃহের বাসিন্দাদের সালাম করবে এবং বের হয়ে আসবার সময়েও সেই গৃহের বাসিন্দাদের সালাম করে গৃহ ত্যাগ করবে।


সালামের নানা মাত্রিক প্রচলনের ফলে ইসলাম অল্প সময়ের মধ্যে শান্তির বাণী বিশ্ব পরিম-লে বিস্তৃত করতে সমর্থ হয়েছিল। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় সালামের ব্যাপক প্রসার জরুরী হয়ে পড়েছে। এই সালামের মধ্যে আল্লাহর নিকট শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য দু‘আর এক অনন্য প্রবাহ প্রবাহিত হতে থাকে। যারা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে তাদের জন্য হিদায়াত লাভের সুযোগ ও সালাম রয়েছে। তাই তো তাদের ক্ষেত্রে যে সালাম বাক্য উচ্চারিত করার কথা বলা হয়েছে, তা হচ্ছে : আস্সালামু আলা মানিত্তাবা‘আল্ হুদাসালাম তাদের ওপর যারা অনুসরণ করে সৎপথ। কুরআন মজিদে এরূপ সালামের উল্লেখ আছে সূরা তহার ৪৭ নম্বর আয়াতে কারিমায়। আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু হযরত মূসা ও হারুন (আ)-কে ফেরাউনের নিকট গিয়ে বলতে ইরশাদ করেন : তোমরা তার নিকট যাও এবং বলো : আমরা তোমার রবের রসূল, সুতরাং আমাদের সঙ্গে বনী ইসরাঈলকে যেতে দাও এবং তাদের কষ্ট দিও না, আমরা তো তোমার নিকট এনেছি তোমার রবের নিকট থেকে নিদর্শন আর শান্তি (সালাম) তাদের ওপর যারা অনুসরণ করে সৎপথ। (সূরা তা-হা : আয়াত ৪৭)।


সূরা নিসার ৮৬ নম্বর আয়াতে কারিমায় ইরশাদ হয়েছে : তোমাদের যখন অভিবাদন করা হয় তখন তোমরাও তা অপেক্ষা উত্তম প্রত্যাভিবাদন করবে অথবা তারই অনুরূপ করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে হিসাব গ্রহণকারী।


অন্য রকমের অভিবাদন কিংবা শুভ কামনামূলক মস্তিষ্কজাত বাক্য উচ্চারণ না করে আমাদের উচিত হবে আস্সালামু আলায়কুম বলা এবং জবাবে ওয়া আলায়কুমুস্ সালাম বলা। সমাপ্ত


লেখক : পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ, উপদেষ্টা ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা:)

More News

Warning: file_get_contents(http://www.sandwipnews24.com/temp/.php): failed to open stream: HTTP request failed! HTTP/1.1 404 Not Found in /home/sandwipnews/public_html/m/news_details.php on line 77

Warning: Invalid argument supplied for foreach() in /home/sandwipnews/public_html/m/news_details.php on line 79