যুদ্ধ যুদ্ধ উত্তেজনা ও আমাদের সামাজিক আচরণ

যুদ্ধ যুদ্ধ উত্তেজনা ও আমাদের সামাজিক আচরণ

অজয় দাশগুপ্ত :: যুদ্ধ কারও কাম্য হতে পারে না। যুদ্ধবাজ মানুষ থাকে কিছু। তারা যুদ্ধের নেশায় পাগল। এছাড়া থাকতে পারে না। কেবল তারাই তা করে। কিন্তু তারা কারা? তারা যখন গদিতে থাকে তখন মানুষ নিরাপদ থাকতে পারে না। এই উন্মাদনা আমাদের উপমহাদেশ এড়াতে পারেনি। আমরা দেশের বাইরে থাকলেও আঁচ এড়ানো পারি না। জন্মেছি পূর্ব পাকিস্তানে। আমাদের চেয়ে ভাল আর কে জানে যুদ্ধ কাকে বলে? কত কারণে যে যুদ্ধ হয়। আর কতভাবে যে তা ছড়িবে পড়ে। কোথায় কাশ্মীর কোথায় পাঞ্জাব। আমরা চট্টগ্রামে বাঙ্কারে ঢুকে দিন কাটিয়েছি। কেন? বোমারু বিমান বোমা ফেলবে বলে। ভেবেছিলেম মানুষ যত সভ্য হবে তত যুদ্ধবিরোধী হয়ে উঠবে। একদিন সভ্যতাই তার যবনিকা টেনে দেবে।


আজ কি তা মনে হওয়ার কারণ আছে?


ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ হওয়ার পরও তার যুদ্ধ করতে হয়। যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব বজায় রাখতে হয়। লাভ লোকসান বুঝি না। বুঝি গান্ধী নেহরুর ভারত আর আগের জায়গায় নেই। পরিবর্তিত সমাজ আর বাস্তবতায় সাধু-সন্ন্যাসী বা সাপ খোঁপের দেশ নামে পরিচিত ভারত আজ চরম উন্নতির শিখরে। তাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে ৭। খোদ আমেরিকারও তা নেই। ভারত কি তার উন্নয়ন অগ্রগতি ভুলে এই যুদ্ধে আসলে লাভবান হবে? হোক বা না হোক ভারতে এখন যুদ্ধের দামামা বাজছে। পাকিস্তানের কথা আলাদা। এই এক দেশ যার আগাগোড়াই সামরিক শাসন। তাদের দেশে যারাই দেশ শাসনে থাকুক আসল পাওয়ার আর্মির হাতে। মুখে আল্লাহ মাথার ওপর আমেরিকা আর আর্মি মুনীরুজ্জামানের এই কথাটা দারুণ- এটা সত্যও বটে। এই দেশ আমাদের কিভাবে ভুগিয়েছে এখনও ভোগাচ্ছে সেটা কি বুঝিয়ে বলার দরকার পড়ে? না পড়লেও বাংলাদেশীরা বোঝে না।


আজ এত বছর পর আবার যখন ভারত ও পাকিস্তান মুখোমুখি আমাদের কি উচিত পাকিদের হয়ে কথা বলা? সরকার বলছে না। বলবেও না। শেখ হাসিনা জানেন নিয়াজীর ভাইপো ইমরান কী চিজ। এত বছর পর ও তার আস্ফালন কমেনি। আমরা কি ভুলে যাব এই ইমরান খান আশির দশকে ক্রিকেট খেলতে এসে চট্টগ্রামে কি করেছিলেন? হোটেল আগ্রাবাদের লবিংয়ে দেখতে আসা বাঙালীর ফুলের মালা পায়ে জড়িয়ে আমাদের অপমান করেছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, আবার এতসব বাজে কথা এত ঔদ্ধত্য এত আগ্রাসন মানুষ নিতে পারেনি। যে কারণে পরদিন খেলার মাঠে বেধড়ক মার খেয়ে ফিরেছিল পাকিস্তানী দল। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল খেলা। ইমরান খান সেখানেই থামেননি। পাকিস্তানের রাজনীতিতে এসে তিনি আবারও প্রতিশোধের পথে হাঁটলেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি নিয়ে এতটাই উত্তেজিত আর অসংযত ছিলেন পার্লামেন্টে প্রস্তাব আনার মতো কাজও করেছে তারা। কেন আমরা ভুলে যাব পাকিস্তান এখনও ষড়যন্ত্র বজায় রেখেছে। তারা আমাদের ইতিহাস বা নেতাদের অপমান করেই থেমে থাকে না, হাল আমলে তাদের টার্গেট আমাদের নেতা শেখ হাসিনা।


অনেক কারণের সঙ্গে আরও একটি কারণ এখন বাংলাদেশের অভাবনীয় উন্নতি। তারা ভেবেছিল শোষণ করা বাঙালী কোন দিনও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। সে দুরাশায় ছাই দিয়ে তর তর করে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ বছর পর বাংলাদেশ হবে দুনিয়ার ২৫তম দেশ। এই কীর্তি পাকিদের ভাল লাগার কথা নয়। ইমরান খানের দেশের মানুষরাই টিভি শোতে বলছে তাদের দেশকে বাংলাদেশ বানিয়ে দিতে। সে দেশের প্রতি কি কারণে দুর্বলতা?


আমি ভারতকে অন্যায়ভাবে অযৌক্তিকভাবে সমর্থনের কথা বলছি না। সেটাও চাই না। ভারতের বোঝা উচিত প্রতিবেশী দেশগুলোর জনগণ তাদের ওপর নাখোশ। শুধু বাংলাদেশ না নেপাল শ্রীলঙ্কার মানুষও তাদের ওপর চটা। সীমান্ত সংঘাত বাণিজ্যিক আগ্রাসন আর মাঝে মাঝে অযাচিত আক্রমণের প্রভাব পড়েছে জনমনে। তাদের সরকার তা বোঝে কি-না বলা মুশকিল। ভারতের ভাবমূর্তির সমস্যা তাদের কোন্ জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে বুঝতে পারলে তাদেরই মঙ্গল হবে। এখন আমাদের প্রশ্ন যুদ্ধ কি আসলে হবে? আর হলে কার কি লাভ?


আমাদের কোন লাভ-লোকসান নেই। থাকলেও তা বাহ্যিক কিছু নয়। তারপরও বাংলাদেশে এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের প্রভাব পড়েছে এবং তা সাংঘাতিকভাবে। বলাবাহুল্য, আমরা একসময় এই দু’দেশের সঙ্গেই ছিলাম। ভারত বিভাগের পর আমরা পাকিস্তানের অংশ হয়েছিলাম। সে ধারণা সে বাস্তবতা যাদের মনে জাগ্রত তাদের সিংহভাগ মানুষ আজ প্রয়াত। তা হলে এরপরও এত উন্মাদনার কারণ কি? তা হলে কি ধর্মভিত্তিক পরিচয়ই সবকিছু? মানুষ কি এত কিছুর পরও এই পরিচয়কেই সবার ওপরে রাখবে চিরকাল? তা যদি না হয়ত পাকিস্তানকে নিয়ে এত উত্তেজনার কারণ কি?


মুক্তিযুদ্ধ আমাদের যে শক্তি ও আলো দিয়েছিল তা কি আজ তাহলে ক্রমেই নিভে যাচ্ছে? জীবনের নানা দিকে আজ স্বাধীনতাবিরোধীদের যে দাপট তা রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহিত কিছু না। বরং রাষ্ট্র এখন চায় মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিস্তার। কিন্তু পাকি ধারাটি মরেনি। বরং তার আগ্রাসন আজ পোশাকে আচারে-আচরণে প্রকট। দুই যুদ্ধংদেহী দেশের বেলায়ও তার প্রভাব দেখছি আজকাল। আমাদের কি এর কবল থেকে নিস্তার নেই? কবে আমরা দেখব বা কোন জেনারেশন পারবে এসব বিষয়ে নির্ভার ও নিজের মতো করে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে? কেন আমাদের কোন্ দিকে ঝুঁকতে হবে? আমাদের তো একদিকেই ঝুঁকে থাকা উচিত যার নিক্তি কোন্ভাবেই হেলে পড়ার কিছু না। আমরা শান্তির বাইরে পা রাখার জায়গায় নেই। আমাদের দেশ ও সমাজে সমস্যার অভাব নেই। এত সমস্যা যা উন্নয়ন বা প্রগতিকেও বুড়ো আঙ্গুল দেখাতে ভয় পায় না। সেখানে পাক-ভারত সংঘাতের সময় আমাদের মনে মনে সাম্প্রদায়িকতা দানা বাঁধলে এক সময় সে দানাই জন্ম দেবে বিষ গাছ।


যুদ্ধ কখনও সমধান হতে পারে না। কাশ্মীরের মানুষের জীবন কি মূল্যবান না? তাদের কি ইচ্ছা কি মনোভাব সেটা বুঝতে পারাই তো গণতন্ত্র। সেটা যদি না হয় তাহলে সমস্যার সমাধান হবে কিভাবে? কাশ্মীর এখন উপমহাদেশের বিষফোঁড়া। সে কবে থেকে তা চলে আসছে। কেউ তার সমাধান চায় কি আদৌ? চাইলে পাকিস্তানকে সাইজ করার কাজ কেউ করেনি কেন? আর করতে পারবেও না। কারণ তার বন্ধু চীন তাকে ছেড়ে যাবে না। এদিকে আমেরিকা ঝুঁকছে ভারতের দিকে এবং সহজে এ নীতি বদলাবে না। তা হলে আন্তর্জাতিকভাবেই তো বিবাদ আর ঝগড়া লেগে থাকবে। তারাই জাগিয়ে রাখতে চাইবে যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব।


মনে করি, ভারতকেই নিতে হবে প্রধান ভূমিকা। উপমহাদেশে তার ভূমিকার মূল্য অপরিসীম। পাকিস্তান মুখে শান্তি বললেও মনে মনে কি না বলা মুশকিল। শেষ করব আমাদের দেশের একটা ঘটনা দিয়ে। আমাদের মানুষজন যেন ভুলে না যায় আমরাও তাদের লাখের কাছাকাছি সৈন্য জেনারেলদের ফেরত দিয়েছিলাম। সে কথা ইতিহাসেই লেখা আছে। গর্বের দেশ মুক্তির দেশের মানুষ যেন যুদ্ধের ফাঁদে পড়ে উগ্র হয়ে না ওঠে। সম্প্রতি অমর্ত্য সেন একটি জরুরী কথা বলেছেন উগ্র জাতীয়তাবাদ কোনভাবেই দেশের পরিচয় হতে পারে না। এটাই যেন মনে রাখি আমরা।

More News

Warning: file_get_contents(http://www.sandwipnews24.com/temp/.php): failed to open stream: HTTP request failed! HTTP/1.1 404 Not Found in /home/sandwipnews/public_html/m/news_details.php on line 77

Warning: Invalid argument supplied for foreach() in /home/sandwipnews/public_html/m/news_details.php on line 79