বাংলাদেশের বিপ্লব, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং জাতির পিতার নেতৃত্ব

বাংলাদেশের বিপ্লব, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং জাতির পিতার নেতৃত্ব

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সালীম আহমাদ খান :: উপনিবেশ শাসনামল থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পৃথিবীতে বিপ্লবের অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে। এই বিপ্লব সক্রিয়ভাবে পৃথিবীর ইতিহাস এবং সর্বোপরি মানব জীবনে আমূল পরিবর্তন এনেছে। বাংলাদেশ পাকিস্তানী শাসন আমল থেকে ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল। ঔপনিবেশিক শাসনের ভাঙন শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে। কিন্তু দেশের জনগণ স্বাধীনতা সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছিল নতুন একটা দেশের জন্ম দেয়ার জন্য।


জাতির পিতা দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদেরকে অন্যায় ও অত্যাচারের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য এবং সর্বোপরি সাম্রাজ্যবাদী শাসন থেকে বের হয়ে আসার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন। মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। সব দিক বিবেচনায় জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্থপতি। তিনি ১৯৪৩ সালে তার পিতার অগোচরে দুর্ভিক্ষ পীড়িতদের মধ্যে মজুদ চাল বিতরণের মাধ্যমে প্রথম নেতৃত্ব দেখিয়েছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর অসাধারণ নেতৃত্বের মাধ্যমে বাংলার মানুষের মুক্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে স্বাধীনতা যুদ্ধের হাল ধরেছিলেন। গ্যারি জে. বেজ ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের একটি টেলিগ্রামের উদ্ধৃতি থেকে উল্লেখ করেন যে, ‘মুজিবের আগমন অপরিপক্ব শক্তিকে পরিপক্ব করে গড়ে তোলে। কারণ, তিনি ছিলেন বলিষ্ঠ, লম্বা ও তীক্ষè দৃষ্টিভঙ্গির একজন সুপুরুষ। তার এই ক্রিয়াকলাপ বাংলার স্বাধীনতার জন্য বৈপ্লবিক জীবনের ঐতিহাসিক দিক এবং মহান নেতার নেতৃত্ব প্রমাণ করে।’


বাংলার জনগণ অনেক অত্যাচার সহ্য করেছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন দ্বারা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তিন লাখ বাঙালী অপুষ্টিতে মারা যায়। যার কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় ব্রিটিশ যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য ইন্ডিয়ান সম্পদের নিষ্কাশন। পশ্চিম পাকিস্তানী, পূর্ব পাকিস্তানকে ১৯৪৭ সাল থেকে উপনিবেশ বানিয়ে রেখেছিল। প্রতিটি ক্ষেত্রে অসমতা ছিল দুই দেশের মধ্যে দ্বিধার মূল কারণ। পাকিস্তানী ইতিহাসবিদ আয়াজ গুল বলেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তান কোন চেষ্টাই করেনি পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনেতিক উন্নয়নের জন্য।’ অন্য ইতিহাসবিদ হামিদ ইউসুফ বলেন, ‘রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অংশ থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বর্জনই আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনের উত্থানে অবদান রেখেছিল।’


শেখ মুজিবুর রহমান অসমতার বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে কর্ম চালিয়ে গেছেন। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন শুরু হলে সেখানেও তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। এর জন্য তাঁকে গ্রেফতার হতে হলো এবং তাঁকে জেলেও প্রেরণ করা হলো। প্রকৃত পক্ষে, শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৩ বার কারাবরণ করতে হয়েছিল যার শুরু হয়েছিল ১৯৩৮ সালে। তারপর ১৯৪০, ১৯৪৮, ১৯৪৯, ১৯৫১, ১৯৫৪, ১৯৫৮, ১৯৬১, ১৯৬৪, ১৯৬৬ সালে এবং সর্বশেষ ১৯৭১ সালে তাকে কারাবরণ করতে হয়। এর অর্থ হলো পাকিস্তানী শাসনামলের ২৪ বছরের মধ্যে তাকে ১২ বছরেরও বেশি সময় কারাগারে কাটাতে হয়েছিল। দুইবার তাঁকে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছিল। গ্রে জে বেজ বলেন, ‘মুজিবের জীবন সংগ্রামে তাঁকে জেলে মূল্য দিতে হয়, কিন্তু সেটা জনগণের কাছে তাঁকে বীরের মর্যাদা দান করে।’ শেখ মুজিব সম্পর্কে পাকিস্তানী সরকার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এবং সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিল, ফলে তাঁকে প্রায়শই গ্রেফতার করে সাধারণ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখত। তিনি কারাগারে থাকাকালীন কয়েদীদের সহযোগিতা করতেন এবং কখনও কখনও তাদের জন্য রান্না করতেন।


১৯৫৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা গঠন করল তখন শেখ মুজিবকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো। কিন্তু তিনি দলকে পুনর্গঠনের স্বার্থে স্বেচ্ছায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করতে মন্ত্রিসভা ত্যাগ করেন। তার জীবনী অধ্যয়নে এটা প্রমাণিত হয় যে, তিনি বিবেচনা করেছিলেন জনগণের সঙ্গে থেকে দলকে শক্তিশালী করে কার্যকরী আন্দোলনের জন্য। এর ফল স্বরূপ এপ্রিল ১৯৭১ সালে তার অনুপস্থিতিতে সরকার গঠিত হয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব¡ প্রদান সহজ হয়ে যায়। পৃথিবীর ইতিহাসে এই রকম সরকার গঠন ধারণা এবং তারই অনুসারীদের দ্বারা ত্বরিত সরকার গঠনের তৎপরতা একটি বিরল দৃষ্টান্ত।


শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার এমন এক নেতার স্বাক্ষ্য বহন করে যিনি আজও সাধারণ জনগণের মাঝে ভালবাসার পাত্র হয়ে আছেন। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তিনি জেল থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন এবং আয়োজিত বিশাল জনসমাবেশে জনগণ ভালবেসে তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দিলেন। এই একক সম্মান তাঁকে দিল জন সমর্থনের একক শক্তি। ৬ দফা দাবি এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের জন্য মুজিব এক অতুলনীয় নেতা হিসেবে পরিগণিত হন। ’৭০-এর নির্বাচনের ফলাফল থেকে এটা নিশ্চিত যে, পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ তাঁকে নির্বাচিত করেছিল, তাঁরই ৬ দফা কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য। গ্রে বেজ বলেন, এটা ছিল পাকিস্তানের প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক নির্বাচন। পশ্চিম পাকিস্তান নির্বাচনের ফলাফল গ্রহণ করল না। অতঃপর মুজিবের ডাকে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ল।


ঐতিহাসিক ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু প্রায় ১৯ মিনিট ভাষণ দেন, যার প্রতিটি শব্দ বিপ্লবের চূড়ান্ত পর্যায়ের কৌশলগত দিকনির্দেশনা তিনি তুলে ধরেছিলেন এবং মানুষের মধ্যে দেশাত্মবোধক অনুভূতি সঞ্চারিত করেছিল। ইতিহাসবিদ লুডেন বলেন, ‘এই বক্তৃতাই তাঁকে পৃথিবীর অন্যতম জনগণকে একান্ত করার বক্তৃতা দানকারী হিসেবে বিবেচনা করে।’ গত ২৫০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্যগুলোর সংগ্রহ থেকে জ্যাকোব এফ ফিল্ড তার ২০১৩ সালের ‘ডব ংযধষষ ঋরমযঃ ড়হ ঃযব ইবধপযবং’ বইটিতে যৌক্তিকভাবে প্রমাণ করেন যে, চার্চিল, লিঙ্কন, মাও এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মতো নেতাদের বক্তৃতা ইতিহাসকে অনুপ্রাণিত করেছে।


১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ অন্ধকার গভীর রাতে নিরস্ত্র বাঙালীদের ওপর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর পরিকল্পিত হামলার মধ্য দিয়ে গণহত্যা শুরু হয়েছিল। লরেন্স লিফসুজ বলেন, ‘এই ভয়ানক গণহত্যা এক রাতে দক্ষিণ এশিয়াতে এর পূর্বে সংগঠিত হয়নি।’ মার্কিন দূতাবাস এটিকে পরিকল্পিত গণহত্যা বলে অভিহিত করে। ২৫ মার্চ মধ্য রাতে মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের রেডিওতে তার স্বাধীনতার ঘোষণার লিখিত বার্তা প্রেরণ করেন। তিনি আন্তর্জাতিক পরিম-লের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বার্তাটি ইংরেজীতে সম্পাদন করেন। তিনি ইতোমধ্যে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণকালে বাংলায় জনগণের কাছে তার নির্দেশনা তুলে ধরেন।


শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে তাঁকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করে ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠন করা হয়। স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় তারই কৌশল গত দিকনির্দেশনা প্রবাসী সরকার পরিচালনায় সাহায্য করেছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধকে গণ্য করা হয় জনগণের যুদ্ধ হিসেবে যেখানে সমস্ত পেশার মানুষ নিয়মিত বাহিনীর সঙ্গে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল।


বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানী জেল থেকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষের প্রাণহানি এবং দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতহানির ঘটনাকে পৃথিবীর সবচেয়ে মানবীয় বিপর্যয় হিসেবে উল্লেখ করেন। এই গণহত্যা এখনও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়নি। গ্রে বেজ বলেন, ‘এই গণহত্যা বসনিয়াকেও হার মানিয়েছে। পাকিস্তানী হায়েনারা ১৯৭১ সালে যে প্রক্রিয়া চালিয়েছিল তা ছিল ভিন্নতর।’ এ্যাডওয়ার্ড কেনেডি সিনেটে ঘোষণা করেছিলেন যে, ‘পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাপ্রবাহ অবশ্যই আধুনিক সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ দুঃস্বপ্নের একটি হিসেবে লেখা হবে।’ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যে বিজয় অর্জিত হয়েছিল তা ছিল বাংলাদেশের জনগণের এবং বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কীর্তি গাথা।


বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ মুজিব কখনও শান্তিরক্ষা মিশনের জন্য অনুরোধ করেননি বরং বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহারের জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন এবং দেশ পুনর্গঠনের জন্য বৈদেশিক সাহায্য চেয়েছিলেন। ইতিহাসের কালো অধ্যায় শুরু হলে হঠাৎই মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ও কল্যাণে অচলাবস্থা বিরাজ করে। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে কিছু সংখ্যক সেনা অফিসার এই মহান নেতাকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে, শুধু ২ কন্যা ব্যতীত যারা ছিলেন দেশের বাইরে। ৩৪ বছর পরে দেশের মাটিতেই রায় দেয়া হলো এই জঘন্য অপকর্মের বিরুদ্ধে। এই জঘন্য হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে জড়িত কিছু সংখ্যক হত্যাকারী অন্য দেশের নাগরিক হয়ে বসবাস করেছে। কোন দেশই, এমন কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডাও হতে পারে না এই সমস্ত অপরাধীদের আশ্রয়স্থল। মানবতা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে উদাহরণ সৃষ্টিতে অবশ্যই এই হত্যাকারীদের নিজ দেশে ফিরিয়ে দেয়া প্রয়োজন।


ভবিষ্যত প্রজন্মের মধ্যে জনগণের শক্তি ও সংগ্রামকে জাগিয়ে তোলার জন্য বাংলাদেশের বিপ্লব ও মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস এবং এর স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী বিশ্বের ইতিহাসবিদদের দ্বারা অবশ্যই অধ্যয়ন করা উচিত। আন্তর্জাতিক মহলকে অবশ্যই পাকিস্তান কর্তৃক গণহত্যার বিষয়টি নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে এবং অস্বীকৃত বিষয়সমূহকে অবশ্যই স্বীকৃতি দিতে হবে। বাংলাদেশের জনগণ এবং বিশ্ব মানবতার অনুভূতির কথা বিবেচনা করে জাতির পিতার হত্যাকারীদের কোন দেশের আশ্রয় দেয়া উচিত নয়। যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ জাতির পিতার হত্যাকারীদের আশ্রয় দিয়েছে সে সব দেশের বাংলাদেশ অভিবাসীদের জাতীয় নির্বাচনের সময় বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। এর ফলে নির্বাচন পরবর্তী সরকার সে সব দেশের জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে এবং হত্যাকারীদের বাংলাদেশে ফেরত এনে আইনের সম্মুখীনে সহায়ক হবে বলে আশা করছি।


[লেখাটি কানাডার ডালহাউসি বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনারে পঠিত]


লেখক : সেনা কর্মকর্তা এবং বর্তমানে কানাডায় পিএইচডি অধ্যয়নরত

More News

Warning: file_get_contents(http://www.sandwipnews24.com/temp/.php): failed to open stream: HTTP request failed! HTTP/1.1 404 Not Found in /home/sandwipnews/public_html/m/news_details.php on line 77

Warning: Invalid argument supplied for foreach() in /home/sandwipnews/public_html/m/news_details.php on line 79