জামায়াতের সংস্কার আরেক চালাকি

জামায়াতের সংস্কার আরেক চালাকি

মুহম্মদ শফিকুর রহমান :: সংবাদপত্রে দেখা গেল জামায়াতের তথাকথিত সংস্কারপন্থীরা নতুনভাবে একটি সংগঠন করার মনস্থ করেছেন। কাগজে এসেছে আজই (২৭ এপ্রিল) তারা এ সম্পর্কিত একটি উদ্যোগের ঘোষণা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাংলার গ্রামে একটি কথা আছে ‘যেই লাউ সেই কদু’। শহরে এসে ভদ্রলোকের পাড়ায় আর্বানাইজড হয়ে হয়েছে ‘নতুন বোতলে পুরনো মদ।’ তবে জামায়াতীদের দলটি নগরকেন্দ্রিক, তাই দ্বিতীয় প্রবাদটিই এখানে খাপ খাবে বেশি। এটিও শোনা যায় এই দলটির অনেকেই ওই পদার্থ গ্রহণে অভ্যস্ত। এ কারণেও দ্বিতীয়টিই এপ্রোপ্রিয়েট। সড়কে যখন বিশৃঙ্খলা, গতকাল শুক্রবারের কাগজের প্রথম পাতায় একটি মিষ্টি মেয়ের ছবি ছাপা হয়েছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীবলে শিরোনামে বলা হয়েছে। সংবাদের ভেতরে বলা হয়েছে ফাহমিদা হক লাবণ্য নামের এই তরুণী ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছিলেন পরীক্ষার খাতা দেখতে। তিনি কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্রী। এ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানের মোটরসাইকেলে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে একটি কভার্ডভ্যানের ধাক্কায় নিহত হয়েছেন। আবার চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ইটভাঁটি এরিয়ায় ছাপড়া ঘরে জীপ ঢুকে চার ইটভাঁটির শ্রমিক নিহত হয়েছেন। মাদ্রাসা শিক্ষক তথাকথিত মওলানা অধ্যক্ষ দ্বারা লাঞ্ছিত ওই মাদ্রাসারই ছাত্রী নূসরাতকে হত্যা করার ঘটনা এখনও সমাজের গালে চপেটাঘাত করে চলেছে। চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে তিন তরুণী বোরখা পরে মসজিদে ঢুকে ইমামের চোখে মরিচের গুঁড়া মেরে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে বেরিয়ে গেছে। এটাকে কেউ নিন্দা করেছে বলে শুনিনি। শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ জঙ্গী হামলায় অকালে প্রাণ হারিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর ফুফাত ভাই আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিমের দৌহিত্র জায়ান চৌধুরী। শেখ সেলিমের জামাতাও শঙ্কামুক্ত নন। এটিও একটি জঙ্গী হামলা। কথাগুলো বললাম এই জন্য যে, এ পরিস্থিতিকে মোটেই স্বাভাবিক বলা যাবে না। এসব ঘটনা আর কেউ অনুধাবন না করলেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যোগ্য উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি এড়ায়নি। তিনি জাতিকে অবহিত করেছেন, ‘দেশে সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা করা হচ্ছে।’ জাতিকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ভাল করেই জানেন জঙ্গীবাদ কী ভয়ঙ্কর। মিসরের Muslim Brotherhood’, আফগানিস্তানের ‘Al-quaeda’, আফগানিস্তান-ইরাক-সিরিয়া-তুরস্কের ‘Islami state (IS) নাইজেরিয়ার ‘Boko Haram, ইন্দোনেশিয়ার Islami Jamat Indoneshia’ , পাকিস্তানের ‘Laskar-e tayoba, Jamat-e  islami’  ও বাংলাদেশের ‘Jamat-e  islami’ এবং ‘Hefayat-e-  islam’ -এর উগ্রবাদী অংশ কত হিংস্র এবং ভয়ঙ্কর আজ কেবল বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্ব অনুধাবন করছে। এগুলো কোন ধর্মীয় বা ইসলামী দলতো নয়ই, দেশপ্রেমিক জাতীয় দলও নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে জামায়াতে ইসলামীর কুৎসিত চেহারা সহজেই জনগণের চোখে ধরা পড়ে। একাত্তরে তারা আলবদর-আলশামস গঠন করে পাকিস্তানী হানাদার মিলিটারি বাহিনীর সঙ্গে মিশে গণহত্যা চালিয়েছে। এরা এতই হিংস্র এবং নারীলোলুপ যে, মা-বোনদের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে পাকিস্তানী হানাদার মিলিটারিদের সঙ্গে মিলে ধর্ষণ করেছে, দিনের পর দিন অনেককে ধর্ষণ করতে করতে মেরে ফেলেছে। এটি হলো একাত্তরে জামায়াতের চেহারা। তারা ৩০ লাখ বাঙালী হত্যায় পাকিস্তানীদের সহযোগী যেমন ছিল তেমনি ধর্ষণ-নির্যাতন করে হত্যা করেছে ৫ লক্ষাধিক মা-বোনকে।


জামায়াতের আরেকটি হিংস্র নৃশংস চেহারা বাঙালী জাতি পুনরায় দেখেছে ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫-তে। ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকাতে এই জামায়াত বিএনপির সঙ্গে মিশে যে হিংস্রতা প্রদর্শন করেছে তাতে গোটা বিশ্ব অবাক তাকিয়েছিল। এ সময় তাদের হাতে ছিল অগণিত পেট্রোলবোমা। পেট্রোলবোমার আগুনে দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছে রিক্সাযাত্রী, পথচারী, কার-বাস-ট্রেন-লঞ্চ যাত্রী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। গরু বোঝাই ট্রাকও তাদের পেট্রোলবোমা থেকে রেহাই পায়নি। তাদের পেট্রোলবোমার আগুনে নারী-শিশু, ঘুমন্ত মানুষ, নিরীহ গরু পুড়ে ছাই হয়েছে। তারও আগে জাতি দেখেছে ‘বাংলা ভাই’, ‘শায়খ আবদুর রহমান’, ‘জেএমবি’, ‘হিযবুত তাহ্রীর’, ‘আনসারুল্লাহ বাংলাটিম’ ইত্যাদি সন্ত্রাসী গ্রুপ। তারা প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্রের মহড়া দিয়েছে, মানুষকে পা ওপরে মাথা নিচের দিকে দিয়ে টাঙ্গিয়ে নির্যাতন করতে করতে হত্যা করেছে। এই বীভৎসতা মানুষকে আতঙ্কিত করার জন্য প্রদর্শন করেছে। এগুলো সবই জামায়াতের অঙ্গসংগঠন। ফেনীর ধর্ষক এবং হত্যাকারী সিরাজ-উদদৌলাও জামায়াত থেকে আসা।


এখন নতুন উদ্যমের যে খবর প্রচার করা হলো তাতে জনগণের চাহিদার কথা বলা হয়েছে। এতে করে জামায়াতের শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে একমত না হলেও ভেতরে ভেতরে একই পথের যাত্রী। এটা তাদের কৌশল জনসমক্ষে আসার। জামায়াতের পদত্যাগী নেতা ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক এখন লন্ডনে আছেন। এদিকে বহিষ্কৃত নেতা মজিবুর রহমান মঞ্জু (ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা) নতুন উদ্যম নিয়ে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া সফর শেষে বর্তমানে লন্ডনে রয়েছেন। লক্ষ্য তারেকের সঙ্গে পরামর্শ করা। লন্ডনে আরও রয়েছে ফাঁসির দ-প্রাপ্ত সাবেক শিবির ও ১৯৭১-এর আলবদর নেতা চৌধুরী মঈনুদ্দিন এবং আশরাফ উজ্জামান। শেষের দুজন মৃত্যুদ-প্রাপ্ত এবং পলাতক। তবে দলটির সেক্রেটারি জেনারেলসহ সিনিয়র নেতারা প্রকাশ্যে সংস্কারের বিরোধিতা করছেন বলে জানা যায়। আমি মনে করি, ওদের সংস্কারের প্রচারও আরেকটি ষড়যন্ত্র। মূলত এরা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে। আর সে কারণে আজ নারী নির্যাতন। সড়কে বিশৃঙ্খলা, যেখানে-সেখানে অগ্নিকা- এবং মানুষের পুড়ে ছাই হওয়া-এমনি একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করা গেলে জামায়াত ফায়দা লুটতে পারবে। তারা সেই পরিস্থিতিই সৃষ্টি করে চলেছে। সেই জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকা- থেকে শুরু করে আজ অব্দি দলটি এবং এই দলের নেতাদের চরিত্র এতটুকু পাল্টায়নি। দেশের সর্বোচ্চ আদালত যখন জামায়াতের বিরুদ্ধে রায় দিল অনেকে ভেবেছে এবার জামায়াতের মধ্যে একটি পরিবর্তন আসবে। কিন্তু না। এদের চরিত্র হলো এক জায়গা থেকে উৎখাত হলে অন্যত্র অন্যপথে আবার দাঁড়াতে নানানভাবে কৌশল করে। তবে হ্যাঁ, শেখ হাসিনার কালজয়ী নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের শক্তি ও স্বাধীনতার সংগঠন এগিয়ে যাওয়ায় জঙ্গীবাদ যেমন দমন হয়েছে, তেমনি জামায়াত-শিবির যত কৌশলই করুক গর্তেই থাকতে হবে। এবার গর্তেও হিট দেয়া হবে। যতই লাফালাফি করা হোক জামায়াতের ভবিষ্যত তারেক রহমানের সঙ্গে বিদেশে পলাতক। তারেক রহমানও আর মুক্ত হচ্ছেন না, সহোদর জামায়াতও আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। জামায়াত তো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। এমনকি স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে দেন। জাতির দুর্ভাগ্য, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে মিলিটারি জিয়া ক্ষমতায় এসে বহুদলীয় রাজনীতি প্রতিষ্ঠার নামে নিষিদ্ধ জামায়াতকে আবার রাজনীতিতে আনেন। তিনি তৎকালীন পাকিস্তানী জামায়াতের বড় নেতা গোলাম আযমকে পাকিস্তানের পলাতক জীবন থেকে দেশে আনেন এবং তার হারানো নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেন। এরশাদ-খালেদাও একই পথে হাঁটেন। বিশেষ করে খালেদা জিয়ার আমলে তারেক রহমানের হাত ধরে জামায়াত-শিবিরের ভয়ঙ্কর উত্থান ঘটে। তারেক রহমান জামায়াতের ছাত্র সংগঠন শিবিরকে নিজ ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের সহোদর বলে ঘোষণা করেন। সেদিন থেকে জামায়াত আবার লাইভ পেয়ে যায়। তাতেও কাজ হয়নি। তারেক রহমান এবং তার মা আদালতের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকে জামায়াত কিছুটা লাইভ পেলেও বিএনপিই যেখানে হাঁটুভাঙ্গা সেখানে জামায়াত-শিবিরের মতো পরগাছা দাঁড়ানোর তো প্রশ্নই ওঠে না। শেখ হাসিনা যেভাবে জঙ্গী তৎপরতা নির্মূল করেছেন, তেমনিভাবে জামায়াত-শিবিরও নির্মূল হবে। ভুলে গেলে চলবে না বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে।
লেখক : জাতীয় সংসদ সদস্য ও সদস্য তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, ( জনকণ্ঠে প্রকাশিত)। 


 

More News

Warning: file_get_contents(http://www.sandwipnews24.com/temp/.php): failed to open stream: HTTP request failed! HTTP/1.1 404 Not Found in /home/sandwipnews/public_html/m/news_details.php on line 77

Warning: Invalid argument supplied for foreach() in /home/sandwipnews/public_html/m/news_details.php on line 79