ছাত্র রাজনীতি কিংবা ছাত্রলীগ নয়, টার্গেট সরকার

ছাত্র রাজনীতি কিংবা ছাত্রলীগ নয়, টার্গেট সরকার

এম নজরুল ইসলাম :: ছাত্রলীগ নামধারী কয়েকজন শিক্ষার্থীর হাতে বুয়েটের আরেক শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকা-ের ঘটনার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে বুয়েটের উপাচার্য এই প্রতিষ্ঠানে সাংগঠনিক রাজনীতি নিষিদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। বুয়েটের শিক্ষক সমিতিও সব ধরনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শিক্ষক-ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ছাত্র রাজনীতি বন্ধ বা নিষিদ্ধ করলেই কি শৃঙ্খলা ফিরবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে? আরও একটি বড় প্রশ্ন হচ্ছে, ছাত্র রাজনীতির বন্ধের যে দাবিটি করা হচ্ছে, এর নেপথ্যে কারা?


বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে আন্দোলন-সংগ্রামের সম্পর্ক। সেই ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু করে এদেশের ছাত্রসমাজ নানা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। সেসব আন্দোলন ছিল পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তির আন্দোলন। নিকট অতীতে আমরা শিক্ষার্থীদের যে আন্দোলনগুলো প্রত্যক্ষ করেছি, সেগুলোর পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ আছে। কোটা আন্দোলনের বিষয়টিই যদি ধরি, তাহলে দেখা যাবে, মূলত মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করতেই আন্দোলনটি গড়ে তোলা হয়েছিল। সেই আন্দোলন থেকে দেয়া হয়েছিল সরকার পতনের আন্দোলনের ডাক। নেপথ্যে কারা ছিল? জামায়াত-বিএনপি। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিল রাজধানীর স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। কিছু দিনের মধ্যেই দেখা গেল সেখানেও ভেজাল ঢুকে গেছে। ২০১৮ সালের ৬ আগস্ট জনকণ্ঠে প্রকাশিত ‘অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির কুশীলবদের চেহারা স্পষ্ট হচ্ছে’ শীর্ষক খবরে বলা হয়, ‘শিক্ষার্থীদের আবেগ কাজে লাগিয়ে প্রতিটি পয়েন্টে সক্রিয় শিবির-ছাত্রদলের প্রশিক্ষিত ক্যাডাররা। বিএনপিসহ সরকারবিরোধী বিশেষ গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ মদদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে সরকারবিরোধী রূপ দিতে গুজব ছড়িয়ে ব্যাগে রামদা, চাপাতি, পোশাক ও আইডি কার্ড পরে শিক্ষার্থী হিসেবে মাঠে নামানো হয় ক্যাডারদের। গুজবকে সত্য ভেবে বিকৃত তথ্য প্রচারে সক্রিয় অত্যুৎসাহীরাও। নিরাপদ সড়কের দাবিতে ‘কোমলমতি স্কুল শিক্ষার্থীদের’ আন্দোলন নিয়ে দীর্ঘ প্রপাগা-া শেষে স্কুলগামী শিক্ষার্থীর বদলে গত দুদিন ধরে রাজপথে সক্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। যেখানে কোটা সংস্কার আন্দোলনে সক্রিয় ছাত্রদল-শিবিরের সদস্যরা ছাড়া কিছুটা সক্রিয় আছেন বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো।’


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিশ্বে বাংলাদেশ একটি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। বিশ্বব্যাংকও বলে দিয়েছে চলতি অর্থবছরে ৭.২% প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে বাংলাদেশের অর্থনীতি। ভঙ্গুর অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। উন্নয়নের মডেল হিসেবে বিশ্ব আজ অনুসরণ করতে চায় বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের এই উন্নয়নের রূপকার জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনা। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আজকের এই উত্তরণ যেখানে রয়েছে এক বন্ধুর পথ পাড়ি দেয়ার ইতিহাস। বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় উঠে আসে জন্মের ৫০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে কীভাবে বাংলাদেশ দ্রুতগতিসম্পন্ন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মতো সফলতা দেখাতে পেরেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্ব, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, এমডিজি অর্জন, এসডিজি বাস্তবায়নসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গ সমতা, কৃষি, দারিদ্র্যসীমা হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, রফতানিমুখী শিল্পায়ন, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পোশাক শিল্প, ওষুধ শিল্প, রফতানি আয় বৃদ্ধিসহ নানা অর্থনৈতিক সূচক আজ উর্ধমুখী। পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, ঢাকায় মেট্রোরেলসহ দেশের মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে। জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বগুণেই বাংলাদেশ আজ এত কিছু অর্জন করে দেখাতে পেরেছে।


বাংলাদেশের এই ইতিবাচক অর্জনগুলো যারা ভালভাবে দেখতে পারে না, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের কাছে চক্ষুশূল। বিশেষ করে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি, সেই বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিকচক্র দেশের সব অর্জন বিনষ্ট করতে চায়। ইতিবাচক সবকিছু নিয়ে তারা সবসময় ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। ১৯৭১ সালেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি তারা। স্বাধীনতার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়নি এই গোষ্ঠী। তারাই সব আন্দালনের মধ্যে ঢুকে সরকার পতনের আন্দোলনের পাঁয়তারা করতে চায়। যদিও তাদের ষড়যন্ত্র অতীতের মতো আবারও ব্যর্থ হবে।


ছাত্র রাজনীতি প্রসঙ্গে ফেরা যাক। বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে মিশে আছে ছাত্র রাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২-এর শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ঐতিহাসিক ৬ দফা ও ১১ দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচন, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনসহ প্রতিটি ঐতিহাসিক বিজয়ের প্রেক্ষাপট তৈরি ও আন্দোলন সফল করায় তৎকালীন ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।


১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যে ছাত্ররা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, পরবর্তীতে তাঁরা প্রত্যেকেই এদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, রেখেছেন বিশেষ ভূমিকা। ১৯৬৬ সালে ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসের যুগান্তকারী ঘটনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা কর্মসূচী এবং পরবর্তীকালে তাঁর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা রুজু হলে ছয় দফা সমর্থন ও শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে ছাত্রদের মধ্যে এক নজিরবিহীন ঐক্য গড়ে ওঠে। ১৯৬৯ সালে সব ছাত্রসংগঠন সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে এবং জাতীয় ও সমাজতান্ত্রিক ধারণাপুষ্ট ১১-দফা দাবিনামা উপস্থাপন করে। ১৯৭১ সালের ১ মার্চের পরে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশ জাতিসত্তার ধারণাগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অগ্রসর হয়। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ তারা বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র সমাজের ভূমিকা ছিল অহঙ্কার করার মতো। গোটা জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে শিক্ষার্থীদের বড় অংশ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে এবং ১৯৯১ সালে তাঁর পতন ঘটানোর ক্ষেত্রে পুনরায় ছাত্ররা ঐক্য ও শক্তির পরিচয় দিয়েছে। তাহলে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি কেন? মাথাব্যথা হলে কেউ কি মাথা কেটে ফেলে?


আবরার ফাহাদ হত্যাকা-ের প্রতিবাদে বুয়েট শিক্ষার্থীরা চার দিন ধরে যে ১০ দফা দাবি আদায়ে আন্দোলন করছেন, তার একটি হলো ছাত্র সংগঠনের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তার বিপক্ষে অবস্থান জানান। জাতিসংঘ ও ভারত সফর থেকে ফিরে প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে এলে এই সময়ে আলোচিত বুয়েটের প্রসঙ্গটিও আসে। তুলে ধরা হয় ছাত্ররাজনীতি বন্ধের বিষয়টিও। এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘একটা ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি উঠাবে যে, ছাত্র রাজনীতি ব্যান। আমি নিজেই যেহেতু ছাত্র রাজনীতি করে এসেছি, সেখানে আমি ছাত্র রাজনীতি ব্যান বলব কেন?’ সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনের উজ্জ্বল ইতিহাস তুলে ধরেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। বলেন, ‘আসলে এই দেশের প্রতিটি সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা কিন্তু ছাত্ররাই নিয়েছেন। আমি ছাত্র রাজনীতি করেই কিন্তু এখানে এসেছি। দেশের ভাল-মন্দের বিষয়টা ওই ছাত্রজীবন থেকে আছে বলেই আমরা দেশের জন্য কাজ করতে পারি। কিন্তু যারা উড়ে এসে বসে, তারা আসে ক্ষমতাটাকে উপভোগ করতে। তাদের কাছে তো দেশের ওই চিন্তা-ভাবনা থাকে না। রাজনীতি একটা শিক্ষার ব্যাপার, প্রশিক্ষণের ব্যাপার, জানার ব্যাপার। সেটা ছাত্র রাজনীতি থেকেই কিন্তু ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে।’ ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা প্রসঙ্গে ষাটের দশকে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উত্তাল আন্দোলনের সময় ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্ব দেয়া রাশেদ খান মেননের সাম্প্রতিক মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক করে তিনি বলেছেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলে মৌলবাদীরা তার সুযোগ নেবে। অতীতে এটাই হয়েছে।’ তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হত্যার রাজনীতি বন্ধ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।


আসলে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে দেয়া কোন সমাধান নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের ভিপি নুরুল হক নূরও ছাত্র রাজনীতি নয়, বরং শিক্ষাঙ্গনে ক্ষমতাসীনদের ‘গু-ামি’ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন। ছাত্র রাজনীতির স্বার্থে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন চালুর দাবি জানিয়েছেন তিনি। নূরও বলছেন, ছাত্র রাজনীতি খারাপ নয়। এই দেশের সৃষ্টি হয়েছে ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে, ছাত্র রাজনীতির মধ্য দিয়ে।


তাহলে সমাধান কোথায়? সমাধান বিশ্ববিদ্যালয় তথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রশাসনের কাছে। প্রশাসন যদি কারও কাছে আত্মসমর্পণ না করে, নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রাখে, তাহলে কোন অঘটন ঘটবে না। শুধু বুয়েট নয়, দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যই বিষয়টি সমানভাব প্রযোজ্য। প্রয়োজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন প্রশাসন। প্রশাসন দুর্বল হলে সেখানে অপশক্তি ঢুকবেই। মানতেই হবে দেশের মূলধারার রাজনীতির মতো ছাত্র রাজনীতিতেও অপশক্তি ভর করেছে। পচন ধরেছে নেতৃত্বে। আদর্শ নয়, ছাত্র রাজনীতির মূল লক্ষ্য যেন হয়ে উঠেছে ক্ষমতা। একইসঙ্গে এটাও লক্ষণীয় যে, ছাত্র রাজনীতি কিংবা ছাত্রলীগ নয়, টার্গেট সরকার। জনবান্ধব সরকারের পতন ঘটাতে চায় জনবিচ্ছিন্ন একটি অপশক্তি। এই ষড়যন্ত্র রুখতে হবে যে কোন মূল্যে।(জনকণ্ঠে প্রকাশিত)।


লেখক : সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং


অস্ট্রিয়া প্রবাসী লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক 

More News

Warning: file_get_contents(http://www.sandwipnews24.com/temp/.php): failed to open stream: HTTP request failed! HTTP/1.1 404 Not Found in /home/sandwipnews/public_html/m/news_details.php on line 77

Warning: Invalid argument supplied for foreach() in /home/sandwipnews/public_html/m/news_details.php on line 79